বিসিএস , বাংলাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা



বিসিএস কেন ম্যানিয়া? বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটরা কেন বিসিএসের দিকে ঝুঁকছে? বিসিএস কেন প্রয়োজন? কেন প্রয়োজন নয়? বিসিএস দিয়েই কি সব গ্রাজুয়েটের প্রত্যাশা পূরণ হয়? বিসিএস কি একমাত্র এ্যাইম ইন লাইফ হওয়া উচিত?
উচ্চশিক্ষার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন কোথায় কাজে আসে? আজ এদেশের লাখো তরুণের হৃদয়ের প্রশ্ন এগুলো।
আমার একজন শিক্ষক ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক থেকে মাস্টার্স করেছিলেন। এখন ইংল্যন্ডেই পিএইচডি করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর স্যার যখন গ্রামের বাড়িতে গেলেন, তখন আশেপাশের সবাই জিজ্ঞেস করল, “তুমি নাকি মাস্টারি চাকরি পাইছ বাবা?”
– হ্যাঁ।
– তো কোন কলেজে?
– আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছি।
– আরে, বুঝলাম তো, কোন কলেজে?
তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা বোঝেন নাই। জিজ্ঞেস করলেন কোন কলেজ! আবার জিজ্ঞেস করলেন,
– আর তুমি কি বিসিএস পরীক্ষা দিছিলা? পাশের গ্রামের ছেলেটা তো এএসপি হইয়া গেছে বিসিএস দিয়া, তুমি দিছো না কেন?
স্যারের কথা বন্ধ হয়ে গেল।
স্যারের বন্ধু, একই সাথে পড়াশোনা করে তিনি হয়ে গেলেন পুলিশের কর্মকর্তা। আর সাধারণত সবাই কর্মকর্তাকে শিক্ষকের চেয়ে বেশি বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে।
রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য সরকারি কর্মকমিশন ( পিএসসি) কর্তৃক প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রথম শ্রেণীর গেজেট কর্মকর্তা বা বিসিএস ক্যাডার হওয়া বাংলাদেশে সর্বোচ্চ চাকরি হিসেবে পরিচিত। তাই আমাদের দেশে বিসিএস এর অর্থ হল- সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা আর ক্ষমতার অধিকারী হওয়া।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ব্যুরোক্র্যাসি আবশ্যক, তেমনিভাবে আবশ্যক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, গবেষণা, দক্ষ ও সৎ রাজনীতিবিদ, রাজনৈতিক সমালোচক, বিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক ইত্যাদি।
এবার আসি বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে।
♦♦বিসিএস ম্যানিয়া কেন?
বর্তমান বাংলাদেশের ৫০০০ বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, অতীতে এদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যারা বাস করত, তারা ১৯৭১ সালের আগে কখনও স্বাধীন ছিল না। অার্যরা এদেশে এসে আমাদেরকে দাস বানিয়ে দিল, আর গালি দিল অনার্য বলে। তারপর মৌর্যরা এই বঙ্গ জনপদ শাসন করল, শাসন করল গুপ্ত রাজারা, তারপর ৪০০ বছর ধরে শাসন করল পাল বংশের রাজাগণ। পালদের পর আসল হিন্দু সেন রাজারা। সর্বশেষ সেন রাজা লক্ষণ সেনের পর আবার মধ্যযুগের সূচনা করল তুর্কিরা। এরপর ইলিয়াস শাহী বংশ, হোসেন শাহী বংশ, আফগান বংশের রাজারা। মুঘলরা দখল করল এদেশ, শাসন করল ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত, তারপর আসল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন, ১০০ বছরের সরাসরি ব্রিটিশ শাসন, ৯০ বছর পর আবার পাকিস্তানি ২৩ বছরের শাসন। ১৯৭১ সালের আগে বাঙ্গালিরা স্বাধীনতার মুখ দেখেনি। যেই কয়েকজন বার ভুঁইয়া জমিদাররা স্বাধীন হতে চেয়েছিল, তারা শায়েস্তা খানের মুখে টিকতে পারেনি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে স্বাধীনভাবে টিকতে পারেনি, উল্টো সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচয় পেয়েছে।
হাজার বছর ধরে যে জাতির ইতিহাস পরাধীনতার, সে স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে কিভাবে? সে ব্যুরোক্র্যাট ছাড়া ভাবতে পারেনা। সে হয়ত কারো অধীনে থাকতে চায়, অথবা কারো ওপরে থাকতে চায়।
ব্রিটিশ শাসনামলে কর আদায়ের জন্য প্রতি জেলায় ডেপুটি কালেক্টররা দায়িত্ব পালন করত। তারা বর্তমান ডিসি (Deputy Commissioner) এর সমপর্যায়ে ছিল। তারা অনেক সময় ব্রিটিশদের অনুগত হয়ে করের জন্য চাপ প্রয়োগ করত জনগণের ওপর। তাই জনগণ ডেপুটি কালেক্টর কে ক্ষমতাবান মনে করত, ভয় পেত। সামন্তবাদি সমাজের জমিদারদের পেয়াদা লাঠিয়াল বাহিনীর অত্যাচারও মানুষ সহ্য করেছিল। তাই মানুষ এখন পুলিশকেও ভয় পায়, ক্ষমতাবান মনে করে। পুলিশকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা হিসেবে, জনগণের বন্ধু হিসেবে দেখে না।
এসব ধারণা বাংলার মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে আছে, রক্তের সাথে মিশে আছে হাজার বছরের এই অভিজ্ঞতা। এরই প্রতিফলন আমাদের দেশে এডমিন ক্যাডার আর পুলিশ ক্যাডারের প্রাধান্য। আর এজন্য ই বিসিএস ম্যানিয়া।
♦♦বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটরা বিসিএসের দিকে ঝুঁকছে কেন?
আমরা নিজেদেরকে মধ্যবিত্ত বা নিন্ম মধ্যবিত্ত সমাজের বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। মজার ব্যাপার হল, যারা বেকার, আয়রোজগার নাই এবং যারা মাসে লাখ টাকা ইনকাম করে, সবাই নিজেকে মধ্যবিত্ত মনে করে।
নিরপেক্ষ থাকা আমাদের স্বভাব।
এই মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত সমাজে আমাদের প্রথম যা প্রয়োজন তা হল একটি সুনিশ্চিত আয়ের উৎস। আর এজন্য সরকারি চাকরির বিকল্প কিছুই আমাদের মনে আসেনা। আর, নৃতাত্ত্বিক ভাবেই আমাদের মনে টাকা আর ক্ষমতার একটা লোভ আছেই। কারণ, একসময় আমরা ক্ষমতাহীন আর গরীব ছিলাম।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের মানুষ অন্যান্য উন্নত দেশের মানুষের চেয়ে মোটা। এর কারণ, তারা একসময় খুব গরীব ছিল, তাই ভাল খেতে পারত না। তখন খাবারের প্রতি তাদের ঈর্ষা কাজ করত। যখন খাবার পেত, বেশি করে খেত। এজন্য নাইজেরিয়ার কালো মানুষেরা মোটা হয়। আমাদের দেশেও “দরিদ্রের ভোগ বেশি”- প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে।
একই প্রতিফলন আমাদের পরিবার, সমাজ চায়, ছেলেটি বা মেয়েটি বিসিএস ক্যাডার হোক, আয় নিশ্চিত করুক, সন্মান-মর্যাদা অর্জন করুক। এমনকি আমি নিজেও এ প্রত্যাশা থেকে মুক্ত থাকতে পারিনি।মধ্যবিত্ত সমাজে উন্নত পেশা ছাড়া মর্যাদাও কোথাও পাওয়া যায় না। পড়াশোনা শেষ হলেই সবাই জিজ্ঞাস করে, “বাবা চাকরি করবা কবে?” শিক্ষিত সমাজে বিয়ে করার কথা চিন্তাই করা যায় না চাকরি বা ভাল আয় ছাড়া। তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে সবাই বিসিএস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ক্যারিয়ার নিয়ে টেনশিত হওয়ার শিক্ষা আমরা সমাজ থেকে পাই।
♦♦বিসিএস কেন প্রয়োজন? 
বিসিএস অবশ্যই প্রয়োজন, যেহেতু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হয়। তাই যথেষ্ট পরিমাণে দক্ষ বিসিএস কর্মকর্তা থাকা আবশ্যক। ক্যাডারগণ যেহেতু রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, শৃঙ্খলা বিধান, আইন প্রণয়ন, বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রকল্প ও চুক্তি প্রণয়ন ইত্যাদি করবেনন, তাই তাদের সর্বোচ্চ analytical ability থাকতে হয়, আইনের প্যাঁচ বুঝতে হয়, ইতিহাস জানতে হবে, সাইকোলজি আর দর্শন বুঝতে হবে।
এজন্যই ক্যাডার হওয়ার পর কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, বিদেশ থেকে উচ্চ ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
কিন্তু কথা হলো, আমাদের ছাত্ররা কেউ কেউ হাইস্কুলে থাকতেই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এটা অবশ্য ভাল, স্বপ্ন দেখা তো খারাপ না। কিন্তু কলেজে উঠার পর পড়া শুরু করে, আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই mp3 নিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে।
চার বছরে পঠিত অনার্স এর বিষয়ে একটি বইও পুরোটা পড়েনা, সিলেবাসের বাইরে রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, আইন, সমাজতত্ত্ব, সাহিত্য কোনো বিষয়ে একটি বইও পড়েনি- এমন ছাত্র বা ছাত্রী অসংখ্য রয়েছে যারা শুধু MCQ মুখস্ত করে।
এভাবে কোনোদিনই রাষ্ট্রীয় আমলা হওয়ার মত জ্ঞান অর্জিত হয় না। বরং মাথা গোবরে ভরে যায়। অনার্স মাস্টার্স এর পাশাপাশি যদি সে সিলেবাসের বাইরে ছোটবড় ২০০ বই পড়ত, পাঠ্য বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করত, সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব দানে যোগ্যতা অর্জন করত, তাহলে বিসিএসের জন্য কখনোই ৫ বছর মুখস্ত করা লাগত না। আমরা আরো বেশি দক্ষ আমলা পেতাম।
বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা থাকলে এমনিতেই অনেক নলেজ গেদার হয়ে যায়। শুধু কতিপয় সহজ কৌশলের বই আর মুখস্তবিদ্যা দিয়ে বিসিএস ক্যাডার হলেও তারা কর্মক্ষেত্রে কখনও ভাল করতে পারবেনা। বরং নীতি নির্ধারনে ভুল করবে, বৈদেশিক সম্পর্ক, চুক্তি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বুঝবে না।
♦♦বিসিএস কেন প্রয়োজন নয়?
“প্রয়োজন নয়” কথাটা বললে একটু স্পেসিফাই করে বলতে হয়, “প্রয়োজন, কিন্তু সবার জন্য প্রয়োজন নয়।”
বিশেষ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, আর উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গ সমাজের সার্বিক উন্নয়ন।
এজন্যই ১৯৫০, ৬০, ৭০, ৮০ এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ৫০-৬০ এর দশকে যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন অনেক স্কলার।
দেশের বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, বাণিজ্য, রাজনীতি, গবেষণা, উদ্যোগ, উদ্ভাবন, উৎপাদন, গঠনমূলক সমালোচনা – এসব উদ্দেশ্য নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে লক্ষ লক্ষ বই পড়ে আছে দশকের পর দশক ধরে। জ্ঞান জমা পড়েছে বইয়ের পাতার নিচে, কিন্তু না মানুষের মনকে আলোকিত করতে পারছে, না রাষ্ট্রের কোনো কাজে আসছে। গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন।
আমাদের এক শিক্ষক, যিনি একজন সহযোগী অধ্যাপক, তিনি একদিন বলেছিলেন, ছাত্রজীবনে তিনি সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে একটা বই নিয়েছিলেন। তখন ২০০৬ সাল হবে সম্ভবত। সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার পর আরেকবার একই বই আনতে গেলেন সেই লাইব্রেরিতেই। বই আনার সময় বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ইস্যু করতে হয়। অবাক হওয়ার বিষয়, ছাত্র অবস্থায় বই আনা আর শিক্ষক হয়ে বই আনতে যাওয়া, এই ১০ বছরেও মাঝখানে বইটা ইস্যু হয়নি। অর্থাত, ১০ বছর বইটা কেউ পড়ার জন্য নেয়নি। শুধু তাই নয়, শতশত এনসাইক্লোপিডিয়া, বই, জার্নাল পড়ে আছে, পড়ার মানুষ নাই।বরং, লাইব্রেরিতে গিয়ে যদি কেউ এসব বড় বড় ইংরেজি লেখা বইয়ের ধুলা মুছে পাতা উল্টায়, আশেপাশের অনেকেই তার দিকে চিড়িয়াখানার প্রাণীর মত তাকায়।
যা বলতে চেয়েছি, শিক্ষার্থীদের একাংশ সরকারি চাকরিতে বা বিসিএসে যোগ দিবে অবশ্যই। আর বাকিদের উচিত knowledge acquisition, assimilation, distribution এবং invention এর কাজ করা। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজই মূলত জ্ঞান তৈরি করা। “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র”- এটাই হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার মূলমন্ত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেসব বিভাগে গবেষণার কাজ বেশি হয়, সেখানে গবেষণাভিত্তিক কাজ বেশি হওয়া উচিত। বাংলাদেশের প্রত্যকটি কর্মক্ষেত্রে যদি গবেষণার জন্য ক্ষেত্র রাখা হতো, তাহলে অল্প কয়েক বছরেই সেসব ক্ষেত্র উন্নতির মুখ দেখতে পারত, গবেষকরা কাজের সুযোগ পেত, বিসিএসের ওপর চাপও কমে যেত। কারণ যেহেতু কখনো সবাই বিসিএস ক্যাডার হতে পারবে না, তাই সবাই ক্যাডার হওয়ার চেষ্টা করেও লাভ হবেনা।
অন্যান্য চাকরি অথবা ব্যাতিক্রম ধর্মী উদ্ভাবনী কাজের দিকে আগাতে হবে।
♦♦বিসিএস দিয়েই কি সব গ্রাজুয়েট দের স্বপ্ন পূরণ হয়?
এটা স্বয়ং বিসিএস ক্যাডাররাও স্বীকার করেন, সবার বিসিএস দেওয়ার দরকার নেই। এবং সব গ্রাজুয়েট রা কখনোই বিসিএস ক্যাডার হতে পারবেনা।বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকেল থেকে পাশ করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে মিনিমাম সাড়ে তিন লাখ ( ৩৫০০০০)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আরও প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৭ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৯৫ টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসন সংখ্যা ৬ লাখ ৩৬ হাজার ৩৪৩ টি। এর মধ্যে শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৮ হাজার ৩৪৩ টি। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ লাখ ৮৯ হাজার, বিশ্ববিদ্যালয় অধীভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪ লাখ। এছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি কোর্স রয়েছে।
এই ৬-৭ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিবছর গ্রাজুয়েশন শেষ করে বের হয়।
৩৮ তম বিসিএসে আবেদন করেছে ৩ লাখ ৮৯ হাজার প্রার্থী! প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনেক দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বাংলাদেশের গ্রাজুয়েটদের সংখ্যা বেশি ! বিশ্বের প্রায় এমন ৪০ টি দেশ আছে, যাদের জনসংখ্যা বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে আবেদনকারীর সংখ্যার চেয়েও কম!! শুধু অস্ট্রেলিয়া আর ওশেনিয়াতেই আছে এমন ১৩ টি রাষ্ট্র!!!
অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ! তাহলে আমরা পিছিয়ে কেন?
বিসিএসে সাধারণত ক্যাডার নিয়োগ হয় ২০০০ এর কম বা বেশি।৫৫% কোটা বাদ দিলে থাকে, প্রায় ৮০০-৯০০। অর্থাত, পড়াশোনা করে ক্যাডার হবে ৮০০-৯০০, বাকিরা কম পড়াশোনায়ই কোটার যোগ্যতায় হতে পারবে। তার মাঝে আবার, প্রফেশনাল ক্যাডারে সবাই পরীক্ষা দিতে পারবেনা। প্রায় ১৩-১৪ টি ক্যাডার প্রফেশনালদের হাতে। সব মিলিয়ে ৪০০ এর মত আসন পাওয়া যায়, যেখানে সবাই আবেদন করতে পারে। তাহলে, এই সাড়ে ৩ লাখের মধ্যে মূলত প্রতিযোগিতা হবে ৪০০-৫০০ টি আসনের জন্য। ১ জনের ক্যাডার পাওয়ার সম্ভাবনা ০.১১%, অর্থাত হিসেব করলে দেখা যায়, প্রতি প্রায় ১০০০ জনে ১ জন ক্যাডার হবে। ভবিষ্যতে প্রতিযোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে।৩৬ তম বিসিএসে আবেদন করেছিল ২ লাখেরও বেশি। ৩৭ তম বিসিএসে প্রায় ২ লাখ ৪৫ হাজার। আর ৩৮ তম বিসিএসে ৩ লাখ ৮৯ হাজার। এই হারে বাড়তে থাকলে আগামী এক দশকে এই সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে। আমরা যদি সাড়ে ৩ লক্ষ বাদ দিয়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ধরেও হিসেব করি ( কারণ সব প্রার্থী ভাল প্রস্তুতি না নিলেও বিভিন্ন কলেজ ভার্সিটির অন্তত ৫০ হাজার প্রার্থী ক্যাডার পাওয়ার জন্য পরীক্ষা দেয়), তাহলে ১ জনের ক্যাডার হওয়ার সম্ভাবনা হয় ০.৮%, অর্থাত প্রতি ১২৫ জনে ১ জন ক্যাডার হবে। বাকি সবাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই। ওদের কি হবে?
পরীক্ষা যদি ১০ হাজার দেয়, তাহলে মোট ২ হাজার ক্যাডার হবে, আবার পরীক্ষা যদি ১০ লাখও দেয়, এদের মাঝে ১ লাখও যদি খুব ভাল প্রস্তুতি নেয়, তবুও ক্যাডার হবে ২ হাজার ই। আমরা শুধু একটা জায়গায় চাপ বাড়াচ্ছি। অথচ উচিত ছিল, যে যেই ব্যাপারে আগ্রহী এবং দক্ষ, সে সেই কাজে যুক্ত হওয়া। তাহলে কাজে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকত। কিন্তু বাংলাদেশে স্বতঃস্ফূর্ত কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।
২০ হাজার ছাত্র যদি অনার্সের পর দৈনিক ৮ ঘন্টা করে ৪ বছর বিসিএস পড়ে, তাহলে ২০০০০ x ৩৬৫ দিন x ৪ বছর x ৮ ঘন্টা = ২৩৩৬০০০০০ ঘন্টা ব্যয় হয় বিসিএস পড়ার পিছনে। প্রায় ২৩ কোটিরও বেশি! অথচ, এই সময়টাতেও সবাই সফল হবেনা, ৪ বছরে ২ টা বিসিএসে হয়ত সর্বোচ্চ ১ হাজার সফল হবে। বাকিরা কি করবে? শিক্ষিত যুবকদের ২৩ কোটি ঘন্টা সময় উৎপাদনশীল কাজে লাগালে, উচ্চশিক্ষায় ব্যয় করলে অথবা গবেষণায় ব্যয় করলে বাংলাদেশ ২০ বছর এগিয়ে যেত ১ বছরের মাঝেই।
♦♦উচ্চশিক্ষা এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা কোথায় কাজে লাগে?
উচ্চশিক্ষার অধিকাংশই বাংলাদেশে কাজে লাগানোর সুযোগ কম। সম্প্রতি পাবনার মাহমুদা নাসার বর্ষসেরা বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নবম শ্রেণীতে উঠার পরেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলেন, সেখানেই কেমব্রিজে পড়াশোনা করেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সেই নাসার বর্ষসেরা বিজ্ঞানী!
বাংলাদেশে থাকলে মাহমুদার সে সুযোগ হতো কিনা কে জানে? হয়ত নাসার বিজ্ঞানী হওয়ার মত মেধা নিয়েও তাকে লাইব্রেরিতে বসে চাকরির পড়া পড়তে পড়তে মারা যাওয়া লাগত। এরকম আরও মাহমুদারা যে অসাধারণ মেধা লুকিয়ে রেখে লাইব্রেরিতে বসে চাকরির পড়া পড়তে পড়তে মারা যাচ্ছে না, তার নিশ্চয়তা কি? হয়ত তারা তাদের মেধা আবিষ্কার করার সুযোগই পায়নি।
এভাবেই অনেক মেধাবীকে আমরা হারিয়ে ফেলতেছি।
জেনেটিক্সে পড়াশোনা করে ব্যাংকে চাকরি করলে বা সরকারি মেডিকেল কলেজে M.B.B.S. পড়ে বিসিএস দিয়ে সরকারি ডাক্তার না হয়ে পুলিশ হলে এই জেনেটিক্স এর জ্ঞান, ডাক্তারি মূল্যবান শিক্ষা অব্যবহৃতই থেকে যায়। সরকার একজন মেডিকেল শিক্ষার্থীর পেছনে ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় করে বলে শুনেছিলাম।
সরকারের ৩৭ লাখ টাকা অপচয় না করে সরকারি কলেজে পড়ে বিসিএস দিলেই পারত, এত টাকা বেঁচে যেত, অথবা এই টাকা দিয়ে অন্য কেউ ডাক্তার হতে পারত। অথবা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে আরও ১০-১৫ জন গরীব মেধাবীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেত।
কারণ, বিসিএস দিয়ে পুলিশ অফিসার হতে গেলে যেকোনো বিষয়ে শুধু অনার্স ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণী থাকলেই চলে, লাখ টাকার ডাক্তারি ডিগ্রি এখানে অপচয় করে লাভ কি?
মহাকাশ নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী একজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র, অথবা রোবট তৈরি করতে আগ্রহী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে যদি ইন্সুরেন্স কোম্পানির জিএম বানানো হয়, তাহলে রোবট বানাবে কে? অনেক ছাত্র এজন্য বৃত্তি নিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। বাংলাদেশের বিজ্ঞানী জাপানে গিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে, আর পুরো জাপানে ১০ বছরেও কয়েক মুহূর্তের জন্য লোড শেডিং হয়না। বাংলাদেশের ডক্টর আতাউল করিম যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উড়ন্ত রেলের নকশা করে, আর আমরা যানজটে বসে থাকি ঘন্টার পর ঘন্টা। এভাবেই আমরা আমাদের মেধাকে বিক্রি করে দিচ্ছি গতানুগতিক চাকরির পদতলে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টরে উন্নত গবেষণার জন্য অন্তত ১০০ জন বিজ্ঞানীর পেছনে যদি বিভিন্নভাবে অপচয় হয়ে যাওয়া টাকা থেকে বাঁচিয়ে ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হতো, আর তাদের গবেষণার জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো, তাহলে ৫ বছরের মধ্যেই ১০০ জন বিজ্ঞানী ১০০ রকম আবিষ্কার করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিত।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১ লাখ টাকা খরচ করে রোবট বানাতে পারে, সেদিন ইউটিউবে দেখলাম মাত্র ২৫ হাজার টাকা খরচ করে কয়েকজন ছাত্র রোবট বানিয়েছে, এদের উন্নত গবেষণার জন্য কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে আমরাও সোফিয়ার চেয়ে উন্নত কোনো রোবট বানাতে পারতাম।
সেদিন কবে আসবে?
লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
       ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Source : http://www.independentbangla.com/

No comments

Theme images by TommyIX. Powered by Blogger.