ছোটবেলার স্মৃতিপটে বিচরণ




"(ছোটবেলার স্মৃতিপটে বিচরণ)"
ডিসেম্বর মাসে স্কুল ফাইনাল শেষ হত বলে শীতকালটা ছিল আমাদের ছেলেবেলার সবচাইতে কাঙ্খিত সময়। ধানকাটার পরে বাংলার ক্ষেত হয়ে যেত পোলাপাইনের ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সবাই মিলে এবড়ো খেবড়ো জমিরে কোনমতে সমান করে পিচ বানান হত। সে এক পিচরে ভাই। বল পইরা কোনটা কোন দিকে যাইবে তার কোন ঠিক নাই।
.
ক্ষেতে ক্ষেতে টুর্নামেন্ট শুরু হইয়া যাইত। জমির আইলের মধ্যে বল ড্রপ খাইয়া একবার ডানে একবার বামে। ফিল্ডারও ডানে বামে করত বলের তালে তালে। আর এইসব ক্ষেতের টুর্নামেন্টের সবচাইতে বড় আকর্ষণ ছিল আম্পায়ারের চোরামি।
.
লাটিম ঘুড়ানো ছিল আরেক মারাত্বক নেশা। একটা আরেকটার লাটিম রে কুপাইতাম। ঘুরাইয়া হাতে তুলে কান নিয়া যাইতাম লাটিমের কাছে,গান গায় কিনা 
.
কি অদ্ভুত কারণে বাবা মায়েরা ভিডিও গেমস খেলারে ড্রাগস নেয়ার মত বিশাল এক অপরাধ মনে করতেন। এই কারণে আরো বেশী খেলতাম। এক মোস্তফা যে কতবার গেম ওভার করছি হিসাব নাই
.
শীতকালে দিনের বেলা ক্রিকেট হইলে রাতে চলত ব্যাডমিন্টন। কর্কের দাম বারো টাকা পোলাপাইন থেকে চাদা নিয়া কিনতাম। কিপটা ছিল কতগুলা এক টাকাও দিত না। 
.
তবে শীতকালের সকালটা শুরু হত দাদীর হাতে ভাপা পিঠা খেতে। ফযরের নামাজ পড়ে দাদী আয়োজন শুরু করত। প্রচন্ড শীতে সকাল সাতটায় ভাই বোন সবাই মিলে ঠক ঠক করে কাপতে কাপতে চুলা ঘিরে বসতাম। ঠান্ডা যাতে কম লাগে তাই সবাই গায়ে গা লাগাইয়া বসতাম আর মনে মনে আম্মারে বকা দিতাম। এত অত্যাচার কইরা পিঠা খাওয়ানোর কোন মানে হয় 


.
একটু পড়েই ভাপা পিঠাটায় কামড় দিলে সব ঠান্ডা গরম হইয়া যাইত। খেজুরের গুড়ের সে গন্ধ এখন আর কই?
.
ফাইনাল পরীক্ষা যেহেতু শেষ সেহেতু সকালে পড়া নাই। এত মজা কই রাখি? ঘড়ির কাটা নয়টার ঘরে বসলেই ব্যাট নিয়া ছুট। সকালে এ পাড়া ও পাড়া খেলা ,বিকালে ফাইনাল আছে ,রাতে আবার ব্যাডমিন্টন খেলতে হইব। সে কি ব্যাস্ততা। 
.
ঘুমানোর আগে ধরতাম তিন গোয়েন্দা। পরীক্ষার কারণে পড়তে পারতাম না জমাইয়া রাখতাম। এবার ডিসেম্বর মাসে কোনটা রাইখা কোনটা পড়ুম। কিন্তু রাত বারোটায় লাইট যে বন্ধ। বুদ্ধি কইরা বিশ টাকা দিয়া টর্চ লাইট কিনলাম পিচ্চি। সে লাইটের এমনি আলো দুই লাইন কভার করতে পারে হাইয়েস্ট। বাত্তি নিভা গেলে অন্ধকারে এক হাত দিয়া টর্চ মাইরা তিন গোয়েন্দা পড়তাম।
.
বখাটেদের খেলা বলা হত মার্বেল কে। আমিও সেইরকম এক বখাটে ছিলাম
এক হাজার ভেতরে ফুল ওয়ালা মার্বেল জিতছিলাম মার্বেল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হইয়া।
.
ডিসেম্বর মাস আর শীতকালটা আমাদের ছেলেবেলায় এমনি কালারফুল ছিল। তবে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ যত আগাইয়া আসত মনের মধ্যে ভয় তত বাড়ত। ওইদিন যে ফাইনালের রেজাল্ট দিবে
.
আজকাল ছেলে মেয়েদের শীতকাল ,গরমকাল নাই। রুটিন সেই একটাই। বাসা ,স্কুল ,কলেজ ,কোচিং ,ফেসবুক ,চ্যাট, শপিং। আজকাল বিনোদনই নাকি শপিং। বাজার করা বিনোদন কেমনে হয় জানিনা। আমাদের সময় বিনোদনের এত আকাল ছিলনা।
.
আজকাল ছেলে মেয়েদের দেখে স্কুলে পড়ে বলে ফ্রাসটেশনে ভুগতেসে। প্রেম ট্রেম কত কি। বিষন্নতা ইনসোমনিয়া। জটিল ব্যাপার স্যাপার 😲😱
.
আর আমরা কলেজে উঠার আগ পর্যন্ত মন খারাপ ,ফ্রাসটেশন কি জিনিস বুঝতামি না। মন খারাপ মানে হইল ম্যাচের সময় প্রাইভেট থাকা। 
মাঠে ক্রিকেট ,স্কুলে রস কস ,রাতে ব্যাডমিন্টন ,বইতে কিশোর মুসা রবিন মন টিভিতে রেসলিং সকালে দাদীর হাতের পিঠা মন খারাপ করার সময় কই ?
.
নব্বইতে বা ২০০৮-৯ এর ছেলেবেলার সে দিনগুলোতে আমরা হয়ত ক্ষেত ছিলাম ,আমাদের এত এত উচ্চমার্গীয় জ্ঞ্যান ছিলনা হয়ত লেমও ছিলাম কিন্তু আমাদের সারাজীবন মনে রাখার মত একটা ছেলেবেলা ছিল..... 

Show more re

No comments

Theme images by TommyIX. Powered by Blogger.